Joy Narayan Sarkar






 ম্রিয়মান // জয়নারায়ণ সরকার

সরকারি চাকরিতে প্রথম পোস্টিং এই মফসসল শহরে। প্রথম দিন জয়েন করেই বাড়িভাড়ার খোঁজে বেরিয়ে পড়েছিল। সাথে ছিলেন হেড ক্লার্ক গাঙ্গুলিবাবু। কোয়ার্টার পেলেও তা নেয়নি। তাতে নাকি বেশি ভাড়া গুণতে হবে। দু-একটা দেখার পর চার নম্বর এই বাড়িটা। বাড়িওয়ালা মেসোমশায় এক কথার লোক। আগে থেকেই গাঙ্গুলিবাবুকে চিনতেন। প্রথমেই বলেন, ব‍্যাচেলরকে ভাড়া দিই না।
সাথে সাথে গাঙ্গুলিবাবু বলেন, না না, ওরা স্বামী-স্ত্রী দুজনে থাকবে।

এরপর মেসোমশায় ঘরগুলো ঘুরিয়ে দেখান। এরইমধ‍্যে চা নিয়ে ঘরে ঢোকেন মাসিমা। ঢুকেই বলেন, তোমাদের ঘর পছন্দ হয়েছে?
জয়ন্ত ঘাড় নেড়ে সম্মতি দেয়। মাসিমা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, মেসোমশায় কটমট করে তাকাতে উনি তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে যান।

মাসিমা বেরিয়ে যেতেই ভাড়া নিয়ে কথা বলেন। ভাড়াটা খুব বেশি লাগেনি জয়ন্তের কাছে। তবে একমাসের ভাড়া ওঁনার কাছে গচ্ছিত থাকবে। যখন বাড়ি ছেড়ে দেবে তখন ওই টাকা ফেরত। ওনার চুক্তি অনুযায়ী মাসের দু-তারিখের মধ‍্যে ভাড়া দিয়ে দিতে হবে। ইলেকট্রিক সাব-মিটার বসানো আছে, তা থেকে হিসেব করে দিতে হবে। জয়ন্ত রাজি হয়ে যায়।

এগারো মাসের এগ্রিমেন্টের জন‍্য নাম, বাবার নাম, বাড়ির ঠিকানা সব লিখে নেন মেসোমশায়।
জয়ন্ত উঠে আসার আগে বলে, এ মাস শেষ হতে তো আর দু-দিন। আমরা ওই পয়লা তারিখে চলে আসব।

***
অফিস থেকে ফিরে বা ছুটির দিনগুলোতে পাড়ার ক্লাবে যাতায়াত ছিল জয়ন্তের। যে কোনও অনুষ্ঠানে সে হাজির থাকত। সে রবীন্দ্রজয়ন্তী হোক বা দুর্গাপুজো। কখনো বুঝতেই পারেনি যে এটা তার শৈশব থেকে বেড়ে ওঠা জায়গা নয়। প্রত‍্যেক লোক কত আপন করে নিয়েছিল তাদের।

এক রাতে জয়ার শরীর খারাপের খবর শুনে অনেকে এসে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। তবে সিরিয়াস কিছু না হওয়ায় একটু বেশি রাত করে ফিরেছিল ওরা। পাড়ার সবাই তখন জেগে আছে, প্রত‍্যেক বাড়ি থেকে খবর নিচ্ছে কেমন আছে জয়া। সে রাতে জয়ন্তের চোখে জল এসেছিল। নিঃস্বার্থ ভালবাসার স্পর্শ পেয়েছিল সে।

বাড়ি ছেড়ে চলে আসার পর আর সেভাবে যাওয়া হয় না। মা বার বার ফোন করে। দাদাও দু-একবার বলেছে ছুটি নিয়ে কয়েক দিন থেকে যেতে। কিন্তু এই এলাকার মোহে আর কোথাও যাওয়া হয়ে ওঠে না। তবে প্রতি মাসে মায়ের সংসারের টাকা মানিঅর্ডারে পাঠাতে ভোলে না জয়ন্ত।

এদিকে মাসিমার সঙ্গে জয়ার ভাব জমে উঠেছে। রোজ সন্ধেবেলায় মাসিমা নিচে নেমে আসেন। কোনোদিন চা-পকোরা, কোনোদিন চা-বিস্কুট দিয়ে শুরু হয় গল্প-গাছার। এখনও কোনও সন্তান না হওয়ায় মাসিমা মাঝে মাঝেই দুঃখপ্রকাশ করেন। তবে কথায় কথায় মাসিমা বলে, জানো জয়া, এখানে একটা জাগ্রত ঠাকুরবাড়ি আছে। চলো, একদিন তোমাকে নিয়ে যাব। মনের কথা খুলে বলবে। দেখো মিলে যাবে সব।

তারপর এক মঙ্গলবার মাসিমার সাথে গিয়েছিল জয়া। যাওয়ার আগে বলেছিল জয়ন্তকে। শুনে সে হেসেছিল, কিন্তু মুখে কিছু বলেনি। আসলে কারও বিশ্বাসে আঘাত করা তার স্বভাবে নেই।

ভাল কিছু রান্না করলে বাটিতে ভরে উপরে দিয়ে আসে জয়া। আবার মাসিমাও মাঝেমধ‍্যে দেয়। এসব দেখে একদিন জয়ন্ত বলেছিল, এখন বাটি চালাচালি, পরে কিন্তু লাঠি চালাচালি।

শুনে জয়া হেসে বলেছিল, ধুর, আমার সাথে কিছু হবে না।
বর্ষার দিনে মাঝে মাঝে জয়ন্তের ঘর হয়ে উঠত ক্লাবঘর। ছেলেরা সবাই সন্ধে থেকে এসে হাজির হত। বাইরে অঝোরে বৃষ্টি। জয়া সবার জন‍্য পেঁয়াজি আর চা এনে ঘরের মাঝে রেখে উপরে মাসিমার কাছে চলে যেত। তুমুল আড্ডা হত। খেলা, রাজনীতি থেকে কারও কারও পেছনেও লাগা হত। জয়ন্ত বেশ উপভোগ করত সে সময়টা।

***
জয়ন্তের এবার পোস্টিং হয় কলকাতা শহরে। শহর লাগোয়া এক জায়গায় ফ্ল‍্যাট ভাড়ায় ঠিক করে এসে রাতে জয়াকে খবরটা দেয়। শোনামাত্র মুখটা পাংশে দেখায় জয়ার। তারপর আস্তে আস্তে জয়া বলে, সপ্তাহে একদিন এখানে আসতেই হবে।

জয়ন্ত বলে, কেন?
জয়া খানিকটা উদাস হয়ে বলে, ওই ঠাকুরবাড়িতে।
জয়ন্ত কোনও কথা বলে না। তারও মন ভাল নেই।

ওই বাড়ি ছেড়ে আসার দিন মানুষের ঢল নেমেছিল। জয়ন্তকে কিছুই করতে হয়নি। পাড়ার ছেলেরা দাঁড়িয়ে থেকে লরি লোড করেছিল। চারজন লোক ঠিক করে দিয়েছিল লোডিং-আনলোডিংয়ের। গাড়ির সামনের সিটে জয়ন্ত আর জয়া বসেছিল।

গাড়ি স্টার্ট দিলে কয়েকজনকে রুমাল দিয়ে ঘন ঘন চোখ মুছতে দেখেছিল জয়ন্ত। মাসিমা তো হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেছিলেন।

নতুন জায়গায় এক মাসেরও বেশি হয়ে গেল ওরা এসেছে। প্রথম প্রথম জয়ন্ত ফ্ল‍্যাটের সামনের ক্লাবটাতে যাতায়াত শুরু করে। তখন জয়া ফ্ল‍্যাটে একাই থাকে। আশেপাশে অনেকে থাকলেও কেউ কাউকে চেনে না।

এক রাতে বিষণ্ণ মুখে বাড়ি ফেরে জয়ন্ত। জয়া তাকে দেখে অশনিসঙ্কেতের আভাস পায়। সামনের ঘরে টিভি চলছিল। জয়া এখন সন্ধে থেকে সিরিয়াল দেখে সময় কাটায়। জয়ন্ত এসে সোজা বাথরুমে ঢুকে যায়। জয়া এবার রাতের খাবারের বন্দোবস্ত করতে রান্নাঘরে চলে যায়। ফ্রেশ হয়ে খাবার টেবিলে এসে বসে জয়ন্ত।

খাবার দিতে দিতে জয়া বলে, কী হয়েছে তোমার? পুরোনো জায়গা ভুলতে পারছো না?
জয়ন্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, কংক্রিটের জঙ্গলে মানুষ যেন হারিয়ে যাচ্ছে। লাভ আর লোকসানের সাপ-লুডো খেলছে এখানে সবাই।

রাতের খাওয়া শেষ করে ধীর পায়ে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ায়। রাস্তার উঁচু উঁচু ল্যাম্পপোস্ট থেকে ছিটকে আসা আলোগুলো বড্ড ম্রিয়মান লাগে জয়ন্তের।

Post a Comment

0 Comments