SANKAR BRAHMA

 



নিবন্ধ

অপ্রিয় হলেও সত্য
(সময় জুড়ে অসময়ের দহন)
শংকর ব্রহ্ম
—————————

কবিদের নিয়ে লোকজনের কৌতূহলের শেষ নাই। জীবনে কবিতা পড়া বলতে পাঠ্য বইয়ের কয়েকলাইন মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় বমি করে আসা। বমি করতে করতে অনেকেই বিসিএস ক্যাডার বনে যায়, অথচ না বোঝে কবিতা , না বোঝে কবিকে।

কবির পাশে না দাঁড়ায় সমাজ , না দাঁড়ায় পরিবার ,
না দাঁড়ায় রাষ্ট্র। কিন্তু কবির পিছনে বাঁশ দেওয়ার জন্য সবাই মুখিয়ে থাকে ! সবাই কবির সমালোচনা করার জন্য একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকে। লেখার সমালোচনা না করে ব্যক্তি-কবির জীবন নিয়ে টানা-হেঁচড়ারও হয় বিস্তর। আবার রাষ্ট্র চান্স পেলে গারদে পুরে দেয় কবিকে !

ইদানীং মোবাইল হাতে পেয়ে ফেসবুকের কল্যাণে কিছু থার্ডক্লাস লোকও কবি ও কবিতার পাঠক হয়ে উঠেছে। অথচ কবিতা যে গল্প-উপন্যাস পড়া নয় এটা তা’রা বোঝেন না কিছুতেই , তারা জানেন না যে কবিতা পড়ার জন্য মানসিক সাধনা লাগে। এরা আবার হুজুগে-সুযোগে কবির স্ট্যাটাসে গালিবর্ষণ করে মজা পায়, কমেন্ট বক্সে বন্যা বইয়ে দেয় !

কবি কোনো দল করলে সমস্যা , কবির রাজনৈতিক মতাদর্শ বা সংশ্লিষ্টতা থাকলে সমস্যা। কবি প্রেম করলে সমস্যা , কবি দ্বিতীয় বিয়ে করলে সমস্যা , কবি নেশা করলে সমস্যা। কবি পর্ণ দেখলে সমস্যা ! সমস্যার অন্ত নেই কবিকে নিয়ে। সক্রেটিস এ’সময় বেঁচে থাকলে , হয়তো কবিকে সমাজচ্যুত করতেন পুনর্বার।
কিন্তু কবি না খেয়ে থাকলে কেউ তার খোঁজ নেয় না , কবি অভাবে থাকলে কেউ পাশে এসে দাঁড়ায় না, কবি চুপ করে থাকলে তাদের অস্থির লাগে , কবি কিছু বললেও তাদের মুখ চুলকে ওঠে কিছু বলবার জন্য ! কবিকে তারা দেবতার মতো দেখতে চায় , অথচ তার সঙ্গে আচরণ করে ভিখারির মতো। কবিকে দু’পয়সার দাম দেয় না, অথচ যে কোনো ইস্যু নিয়ে কবির মতামত প্রত্যাশা করে। সেই মতামত আবার তাদের মন মতো না হলে কবিকে হেনস্থা করে ধুয়িয়ে দেয়!
কবির জন্য রাষ্ট্রীয় কোন প্রণোদনা নাই , সামাজিক নিরাপত্তা নাই ; কিন্তু কবির পিছনে বাঁশ দেওয়ার জন্য বাঁশের অভাব নাই। অথচ এরা জানেন না যে , কবি প্রতিদিন ঘরে ঘরে জন্মায় না। কবি প্রকৃতির আশীর্বাদপুষ্ট এক একজন মহামানব। কেউ কেউ বলেন আবার , এরা ‘স্বর্গচ্যুত দেবদূত’।

” যে দেশে একজন সুকবি জন্মে, সে দেশের সৌভাগ্য।
যে দেশে কবি যশঃ প্রাপ্ত হয়, সে দেশের আরও সৌভাগ্য। যশঃ মৃতের পুরস্কার, তিনি জীবিতকালে যশস্বী নহেন ; যিনি যশের অপাত্র , তিনি জীবিতকালে যশস্বী” -বঙ্কিমচন্দ্র।

আর প্রতিদিন আবর্জনা স্বরূপ অ-মানব ঘরে ঘরে জন্মায়। সমাজের ঘুষ খোর, দুর্নীতিবাজ লোকদের স্যার স্যার ডেকে মুখে ফেনা তুলে ফেলা এইসব অতি-দানব লোকজনই, সামান্য একটা স্ট্যাটাস নিয়ে কবিকে গালাগালি করেন, এরা কেউ-ই সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ নাকি?
যারা কবির নখের যোগ্য নয় , তারাও রাজনৈতিক বা মৌলবাদে আক্রান্ত হয়ে কবিকে গালমন্দ করেন যখন তখন।
শতবছর পরেও কবির কবিতা সাধারণ মানুষের মুখে মুখে থাকে ; অথচ হারিয়ে যায় এইসব আবর্জনা স্বরূপ কমেন্টকারী কুলাঙ্গারেরা !

যারা বলেন— কবি যদি মানুষ না হয় , কবি যদি নিরপেক্ষ না হয়, কবি যদি সত্যবাদী না হয়, কবি যদি চরিত্রহীন হয় , তবে সে কবি না। কিন্তু পরমসত্য হচ্ছে , মহাকাল – ব্যক্তি-কবির যাপিত জীবনের কিছুই ধারণ করে না সে’ভাবে। মহাকাল গ্রহণ করে ব্যক্তির কর্ম। তার সৃষ্টি।

‘সোনার তরী’ কবিতায় রবিঠাকুর বলেছেন—
“এতকাল নদীকূলে
যাহা লয়ে ছিনু ভুলে
সকলি দিলাম তুলে
থরে বিথরে—
এখন আমারে লহ করুণা করে।”
কিন্তু মহাকালরূপী সোনার তরীতে কবি ব্যক্তি মানুষটির স্থান হয়নি, সেখানে ঠাঁই পেয়েছে কবির ( সৃষ্টি) সোনার ধান।
সময়তরী বলছে—
ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই— ছোটো সে তরী
আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।
শ্রাবণ গগন ঘিরে
ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,
শূন্য নদীর তীরে
রহিনু পড়ি—
যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।”

আমাদের চারপাশে অসংখ্য অগণন ভালো মানুষ, নিষ্ঠাবান মানুষ আছেন , কিন্তু সেইসব ভালো মানুষদের কত জনকে মহাকাল মনে রাখে? মহাকাল মনে রাখে একমাত্র তার কর্মকে। কর্মকে ধারণ করাই মহাকালের ধর্ম। মহাকাল মনে রাখে সৃষ্টিশীলের সৃষ্টিকে।
আইনস্টাইন কয়টা বিয়ে করেছেন, নিউটনের প্রেমিকা কয় জন ছিলো বা অ্যালেন গিন্সবার্গ সমকামী ছিলেন কিনা এসব কিন্তু মহাকালের বিবেচ্য বিষয় নয়, মহাকাল স্মরণ করে, বরণ করে, ধরে রাখে একজন সৃষ্টিশীলের সৃষ্টিকে। ভালো মানুষের চেয়ে সৃষ্টিশীলের কদর বেশি তাই মহাকালের কাছে। সভ্যতার অগ্রযাত্রায় তাঁরা নমস্য!

অন্যদিকে মানুষের সংজ্ঞা, ভালো মানুষের সংজ্ঞা এসব আপেক্ষিক। কিন্তু কবির সংজ্ঞা সার্বজনীন।
বিশেষ কোন গায়িকার কণ্ঠে যখন আমরা রবিঠাকুরের ‘ভালোবাসি ভালোবাসি’ গানটা শুনি— তখন কিন্তু আমাদের ভাবনায় ব্যক্তি রবি ঠাকুরের চিন্তা আসে না , কবি কাকে ভালোবেসেছেনন, কতজনের সাথে তিনি প্রেম করেছেন? এই গান তিনি কাকে ভেবে লিখেছেন? এ’সব তখন অর্থহীন হয়ে যায়। আমরা সেই গানের সাথে , গানের কথার সাথে একাত্ম হয়ে নিজেদের অনুভব করতে পারি। একইভাবে জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ পড়তে পড়তে আমরা কিছুতেই এটা ভাবি না যে , কবির ব্যক্তি-জীবন কতটা বিষাদময় ছিলো। কবি অনাহারে কিংবা অর্ধাহারে কাটিয়েছেন কিনা দিনের পর দিন। কতটা অসহনীয় জীবনযাপন করেছেন তিনি।
কবি রুদ্র মহম্মদ মদ্যপ ছিলেন কিনা , কবি সমুদ্র গুপ্ত গাঁজা খেতেন কিনা সেটা বিবেচ্য নয়? এটাও বিবেচ্য নয় – শক্তি চট্টোপাধ্যায় দিনে ক’পেগ মদ খেতেন ,কিংবা সুনীল গাঙ্গুলী কতজন নারীর সঙ্গ যাপন করেছেন , কিংবা তসলিমা নাসরিন কয়জন পুরুষের শয্যাসঙ্গিনী হয়েছেন , এ’সব মোটেই বিবেচ্য নয় মহাকালের কাছে ।
শুধু বিবেচ্য হচ্ছে তাঁদের সৃষ্টি। ধূমপায়ী, অধূমপায়ী, মদ্যপ, নেশাসক্ত, বহুগামী, চরিত্রহীন, লম্পট, হুজুর, পাদ্রী এসব বিশেষণগুলি কবির কবিতার সাথে কিছুতেই সংযুক্ত হয় না।
পরিপাটি ভদ্রলোক, সৎ ও বিচক্ষণ বিচারক, অনেক সরকারী আমলা , মন্ত্রী আমাদের দেশে অনেকে ছিলেন, আমরা তাদের ক’জনের নাম মনে রেখেছি ?
মনে রাখিনি তার কারণ, তাদের কোনো সৃষ্টি নেই,
কিন্তু রুটির দোকানে কাজ করা দুখু মিয়া দেশের জাতীয় কবি। কবি কাকে বিয়ে করেছেন, কার সাথে প্রতারণা করেছেন এসব বিবেচ্য নয় , বিবেচ্য হচ্ছে কবি কী রেখে গেছেন আমাদের জন্য !
আমরা প্রদীপ্তকণ্ঠে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা পড়ি, গণসংগীত গাইতে-গাইতে উদ্দীপ্ত হই। মাঝরাতে বিভোর হয়ে শুনি তাঁর অনুপম সৃষ্টি— ‘মোর ঘুম ঘোরে এলে মনোহর!’

কবিতা লেখার সাথে, বিশেষ করে সাহিত্যের সাথে লেখক কবির চরিত্রের ভাল-মন্দের প্রশ্ন অবান্তর , কারণ ওটা যেমনই হোক না কেন , তা একান্তই তাঁর ব্যক্তিগত, যেখানে কারোর কোনও নিজস্ব বক্তব্য বা অভিযোগ নিশ্চয়ই থাকতেই পারে। সেটা কবিতার বিচারে প্রযোজ্য নয়।
কবি হচ্ছেন সময় জুড়ে অসময়ের দহন।
মানেন বা নাই মানেন , কীই-বা তাতে আসে যায় তা’তে? কবিকে— ব্যক্তিতে নয়, খুঁজুন তাঁর সৃষ্টিতে – কবিতায়!

[ ঋণ স্বীকার –
( কালের লিখন) সংগৃহীত ও সম্পাদিত। ]

Post a Comment

0 Comments